কবি-অনুবাদক মজিদ মাহমুদ
মজিদ মাহমুদ
জন্ম:-১৬ এপ্রিল,১৯৬৬,
পাবনায়। পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে। লেখালেখির হাতে খড়ি শিশুবেলা থেকে। কবিতা তাঁর নিজস্ব জগৎ হলেও গবেষণার কাজেও তিনি দক্ষ। নজরুল ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অধীনে কাজ করেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৫০ এর বেশি।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ:- বল উপাখ্যান,আপেল কাহিনী, ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম,মাহফুজামঙ্গল,কাব্য সঞ্চয়ন প্রভৃতি।প্রবন্ধগ্রন্থ:- ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ,কেন কবি কেন কবি নয়, নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র, রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ প্রভৃতি।
হিন্দি ভাষার কবি মঙ্গালেশ দব্রালের কবিতার অনুবাদে কবি-অনুবাদক মজিদ মাহমুদ
'কবিকা একেলাপন’-এর কবি
মঙ্গালেশ দব্রাল মারা গেলেন ৯ ডিসেম্বর, ২০২১ বুধবার। মহারাষ্ট্রের কবিবন্ধু রঞ্জনা মিশ্র জানালেন- মঙ্গালেশ দা’র খবর নিশ্চয় জানি, তিনি আর নেই। এই খবর কেবল একটি ব্যক্তিগত ব্যথা হয়ে থাকতে পারত, কিন্তু তার ক্ষেত্রে তা হয়নি- কারণ কবি হিসেবে তিনি ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে ছিলেন আগেই, দক্ষিণ এশিয়ার কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে রয়েছে তার অসংখ্য গুণগ্রাহী। বিষয়-মাহাত্ম্য এবং প্রকরণের নতুনত্বে তার কবিতা আদৃত হয়েছে কাব্যপিপাসুদের মধ্যে। বণ্টন ও সাম্যের দাবিতে, ন্যায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের সারির যোদ্ধা। রাষ্ট্রের সব দমন নীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন একাট্টা। মানুষে মানুষে বিভেদ, বর্ণপ্রথা, হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে তিনি ছিলেন সজাগ। কবি ভারভারা রাওয়ের মতো বর্তমান হিন্দি ভাষায় অকুতোভয় যে কজন কবির নাম আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে- দব্রাল তাদের অন্যতম।
উত্তরখণ্ডে জন্মগ্রহণকারী দব্রাল দিল্লির কবি ও সাংবাদিক মহলে ছিলেন ভরসার আশ্রয়স্থল। যদিও তার একলা চলার নীতি বন্ধুমহলে অজানা ছিল না; তবু তিনি কাউকে একলা চলতে দিতেন না, কবিদের সঙ্গী হয়ে থাকতেন প্রয়োজনে। তাকে ছাড়া অনেকের পথ চলা কিছুটা কঠিন ছিল। তিনি লিখেছিলেন, ‘কবিকা একেলাপন’- কবির একা পথ চলার গল্প। দিল্লিতে একাডেমি পুরস্কার গ্রহণের সময়েও তিনি কবির একাকিত্ব নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন; বলেছিলেন পাবলো নেরুদার সেই ‘মেলানকলি’র কথা- একজন লোক এক কবির কিছু বিষণ্ণতার কবিতা পড়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। অনেকটা জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের এক দিন।’ সব কিছুর মধ্যে থেকেও কবি থাকেন একা- কবি প্রতিনিয়ত আত্মহননের পথে এগিয়ে চলেন। অবশ্য দব্রালের এই আত্মহত্যা অনেকাংশে রবীন্দ্রনাথের একলা চলার মতো পথ-চলার প্রত্যয়। কারণ কবি কেবল তার নিজের জীবনযাপন করেন না, কবি তার জনগোষ্ঠীর জীবনের অংশ হয়ে ওঠেন, যাদের কণ্ঠস্বর নেই তাদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।
মঙ্গালেশ দব্রেলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ভোপাল আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে। হয়েছিল অল্প কিছু ভাব বিনিময়। পাটনা থেকে আসা কবি অনুবাদক যাদবেন্দ্র পাণ্ডে পরিচয়ের সূচনা করেছিলেন, বলেছিলেন শক্তিমান কবি, একাডেমি পেয়েছেন- এটি তার পরিচয় নয়। ফিরে আসার মাত্র কিছুদিন পরে ভোপাল সাহিত্য একাডেমি আমায় আমন্ত্রণ জানাতে চায়, আমি রাজি থাকলে তারা আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেবেন। ইংরেজি ও হিন্দি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের ফলে হয়তো আমি তাদের কিছুটা প্রশ্রয় পেয়েছি। ‘আপেল কাহিনি’র কবিতা ইংরেজি ‘ফেবল অব দ্য আপেল’ পড়ে লিখেছিলেন- এই কবি ফায়েজ এবং মাহমুদ দারবিশের মতো শক্তিশালী। এসব ব্যক্তিগত ভাব বিনিময় আমাদের সম্পর্কের সেতুকে আরো শক্তিশালী করেছিল।
মঙ্গালেশ দব্রাল জন্মেছিলেন ভারতের উত্তরখণ্ডে ১৯৪৮ সালে। সত্তর দশকে মার্কসবাদী নকশালপন্থি ছাত্র আন্দোলনে তার আত্মপ্রকাশ। তিনি সিপিআই-এমএলের জনসংস্কৃতি মঞ্চের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তার কবিতায় মুক্তবাজার ব্যবস্থার কুফল পুঁজিবাদী দানবের বিরুদ্ধে ছিল সোচ্চার। তিনিই প্রথম কবি- যিনি ২০০২ সালে ভয়াবহ গুজরাট দাঙ্গার বিরুদ্ধে কবিতায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পরে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে আশুতোষ ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘মঙ্গালেশ ডাবরাল ছিলেন নাজুক দ্বিধাগ্রস্ত ও সতর্ক সম্ভাষণের কবি। তার কবিতার ভাষা সাম্প্রতিক হিন্দি কবিতায় নতুন শৈলীর দাবিদার। তিনি মনে করতেন জনগণ রাজনীতিকদের প্রত্যাখ্যান করলেও কবিতা উদযাপন করবেন।’ এই মেধাবী কবির প্রতি বাঙালি কবিদের পক্ষ থেকে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।
মঙ্গালেশের কয়েকটি কবিতা পাঠকের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো। কবিতাগুলো মূল হিন্দি থেকে ইংরেজি করেছিলেন মানস ফিরাক ভট্টাচার্য।
স্বৈরাচারের স্বরূপ
স্বৈরাচারীরও থাকতে পারে নিষ্পাপ মুখ
তার নখ ও দাঁত তেমন নয় বড়
তার চক্ষুযুগল নয় লাল
বরং ঠোঁটে লেগে আছে স্মিত হাসি
প্রায়শ আমন্ত্রণ জানায় তার বাড়িতে
বাড়িয়ে দেয় নরম হাত
আশ্চর্য তাকে দেখে লোকে পায় ভয়
তার বাড়িতে পুরনো তরবারি বন্দুক
সৌন্দর্য বর্ধনে ঝুলছে দেয়ালে
ড্রইং রুমের মনোরম পরিবেশ-
চারদিকে দামি শিল্পকর্ম
ভেসে আসছে মৃদু সংগীত
হৃদয়ে জাগায় নিরাপত্তার বোধ
এই সব স্বৈরাচার আজ জনপ্রিয় বেশ
তাদের মধ্যে রয়েছে মৃত স্বৈরাচারের রেশ।
মূল : প্রুফ অব দ্য টাইরান্ট
একদা দিল্লি
সেই ছোট্ট শহর, এক সকালে
সন্ধ্যা কিংবা এক ছুটির দিনে
দেখেছিলাম কিছু গাছের শিকড়
মাটিকে শক্ত করে আছে ধরে
বাতাসে কাঁপছিল তার পাতা
তখনো রহস্য ছিল বাকি
জনশূন্য পথ
অকস্মাৎ কাউকে যেত দেখা
শোনা যেতো দু-একজন বন্ধুর কণ্ঠধ্বনি
এর কিছুদিন পরে
এই ছোট্ট শহর পৌঁছালো
এক কোলাহলময়, নোংরা, দুশ্চিন্তায় মোড়া
লোভে পরিপূর্ণ এক বড় শহরে।
মূল : এ ডে ইন দিল্লি
কবিতা
কবিতা ছিল সারাদিন ক্লান্ত
আর রাতে ঘুমে অবসন্ন
আর সকালে জিজ্ঞাসা তার
রাতে খেয়েছিলে কিছু?
মূল : পোয়েট্রি
যাওয়া হয়নি
আমার কোথাও যাওয়ার ছিল, যাইনি
আমার কিছু করার ছিল, করিনি
যার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম, সেও আসেনি
আনন্দে যে গান গাইতে চেয়েছিলাম, গাওয়া হয়নি
কিছুই ঘটেনি যখন- দরকার ছিল দীর্ঘ ঘুমের, তাও পারিনি
এসব ভাবতে পারলেই ভালো
হয়তো সে সব কোথাও নেই, অথবা করিনি সেই সব কাজ
হয়তো অপেক্ষার মানে নেই, গান কিংবা ঘুম
কোথাও কিছু নেই।
মূল : আই হ্যাড সামহোয়ার টু গো
খুব ভাল লাগলো ! শ্রদ্ধেয় কবি মঙ্গালেশ দব্রালকে পরিচিত করে দেবার জন্যে কবি মজিদ মাহমুদকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
ReplyDelete