সম্পাদকের জানালা: কবি-সম্পাদক অধীরকৃষ্ণ মন্ডল


অধীরকৃষ্ণ মণ্ডল

জন্ম:-১৯৫২,পশ্চিম রাধানগর, গোসাবা, দক্ষিন ২৪পরগনা। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ:-ডুব দিয়ে যাও পানকৌড়ি, আমাদের আকাশ আমাদের তারা, ছুটন্ত দিনলিপি,কালো পাথরের সকালের শুদ্ধতা, পৃথিবীর সরলতম মাছেরা,হরপ্পা রাখি পা, মাটির শ্লেটে অক্ষর বীজ,পরাগ পুরাণ।বনানী-র উল্লেখযোগ্য সংখ্যা:-কবি বিনোদ বেরা   , কবি সামসুল হক, পুরাতাত্ত্বিক তারাপদ সাঁতরা ,শত কবি শত ভাবনা,১১৫ জন কবির সাক্ষাৎকার, সাহিত্যিক আব্দুল জব্বার, বিশ্ব কবিতার অনুবাদ,লিটল ম্যাগাজিন, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ এর সত্তর দশকের কবিদের কবিতা পর্যালোচনা, শূন্য দশকের কবিদের কবিতা পর্যালোচনা (পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ত্রিপুরা ও আসাম), উলুবেড়িয়ার শিল্প ও সাহিত্য ইত্যাদি।সম্পাদক: আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মিলন।পুরস্কার ও সম্মাননা:-পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি কর্তৃক পুরস্কার ২০১০ (সাহিত্যিক আব্দুল জব্বার সখ্যার জন্য), মহাদিগন্ত পুরস্কার, নতুন গতি পুরস্কার, কোলকাতা লিটল ম্যাগাজিন ও গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক পুরস্কার,বাংলাদেশ প্রেসক্লাবে স্বতন্ত্র সম্মাননা ইত্যাদি।

@ সম্পাদকের জানালা




এ সংখ্যার জন্য মনোনীত সম্পাদক হলেন 'বনানী'-র সম্পাদক কবি অধীরকৃষ্ণ মন্ডল

বনানী:একঅপার স্বপ্নের সওদাগর

সম্পাদনা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। শিল্পিত মনন ও শিল্প দক্ষতা তার হাতিয়ার। মৃৎশিল্পীর হাতে সাধারণ খড়-মাটি অম্লান ঐশ্বর্যে ভরা এক চিত্রময়তায়। সম্পাদনার মধ্যে থাকে সেই কারুকৃতি যা প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হয় লিটল ম্যাগাজিনে। সামাজিক দায় ও দায়িত্ব হিসেবে কাঁধে তুলে নেয় সব সাহিত্য গৌরবকে। পৌঁছে দেয় পাঠক সমাজে। একজন সম্পাদকের পক্ষে এ কাজ গৌণ। মুখ্য হলেন তাঁরাই যারা প্রতিটি স্তরে ফোটা ফোটা রক্ত এনে দিয়েছেন ব্লাড ব্যাংকে।এছাড়া এমন কিছু মানুষ আছেন যারা সব শুভ কাজের পেছনে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রদীপের তেল আর দেশলাই কাঠি এনে দেন আগুনের প্রজ্জলন শেখাতে।

সেই প্রজ্জ্বলনকে আরও আলোময় করে তুলতে 'বনানী'র জন্ম সাধারণ এক গরিব ঘরে। অথচ তার স্বপ্ন ছিল অপার।তাই ঝাঁপ দেয় সাহিত্য পরিবেশহীন দুরূহতায়। তবে কি স্বপ্নের অঙ্কুরোদগম অস্বাভাবিক! কিন্তু না, দেখলাম সিঁড়িতে হাত ধরে আছেন প্রাবন্ধিক লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ সুব্রত চট্টোপাধ্যায়। একহাত তাঁর সম্পাদকের হাতে, অন্য হাত 'বনানী'র দিকে। তখন ডি টি ডি শহীদ স্মৃতি বিদ্যালয়ে অস্থায়ী শিক্ষকতা জীবনে বনানীর দায়ভার গ্রহণ। একদিকে অবিভক্ত ২৪ পরগনার সন্দেশখালি থানা, অন্যদিকে একই জেলার গোসাবা থানা। সেখানে তখন সাহিত্যচর্চার বাতি জ্বলে ওঠেনি তেমন ভাবে। পায়ে হেঁটে হেঁটে যাতায়াতের দিন আর বর্ষায় নদীর পিচ্ছিল রাস্তা। এমন পথে ওঠা নামার মধ্যে ছিল সাহিত্যের পথ চলা। তখন নিজের বাড়ির অবস্থাও তলানিতে। যৎসামান্য জমিজমা, ভিটেবাড়ি। এই প্রতিকূলতার সামনে নিজেকে ও পত্রিকাকে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে সব বাসনা মাটি হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু অন্ধের কাঁধ যে বড় শক্ত। ভার বহনের জন্য সর্বদা প্রস্তুত। তখন অবশ্য পত্রিকা প্রকাশের খরচ-খরচা এখনকার তুলনায় কম হলেও সেটুকু অর্থ সংগ্রহ করাও দুঃসাধ্য বিষয় ছিল। 

দেওয়াল পত্রিকা 'পল্লীশ্রী' থেকে 'বনানী'-র সরকারি অনুমোদন ড. সমরকৃষ্ণ মজুমদারের সহায়তায় ১৯৮২

সালে পাকাপাকি। সে সময় পত্রিকা প্রকাশের আর্থিক ভার বহন করতেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীনেশ চন্দ্র মন্ডল ও অন্যান্য সহমর্মীরা। তবুও সমস্যার শেষ থাকে না। শুধু অর্থেই সব কাজ সমাধান হয় না। প্রধানত এলাকায় সাহিত্য পরিবেশ ছিল প্রতিকূলে। সেজন্য প্রথম পদক্ষেপ সাহিত্য সভাসমিতি গড়ে তোলা। ধীরে ধীরে অনেকের মধ্যে সাড়া জাগে সাহিত্য ভাবনা। বিশেষত লোকসংস্কৃতি গবেষক ড. নির্মলেন্দু দাস, সুব্রত চট্টোপাধ্যায়, এস ডি ও ড. সমরকৃষ্ণ মজুমদার ও কবি বিনোদ বেরার সংস্পর্শে হাতিয়ার হয়ে ওঠে 'বনানী'-র সাহিত্যচর্চার পরিবেশ ও ভিত্তিস্থাপনের পটভূমি। 


তবুও ব্যক্তিগত জীবন সংগ্রামে 'বনানী'র সম্পাদনার ক্ষেত্রে প্রতিকূলতার উত্তাপ কম ছিলনা। তখন ব্যক্তিগত জীবন সংগ্রামে প্রতিটি স্তরে বনানী মিলেমিশে একাকার। পিতা নরেন্দ্রনাথ মন্ডল পেশায় চাষী এবং মা যশোদা দেবী সংসারের আঁচে পুড়ে দগ্ধ প্রাণ গৃহকর্ত্রী। পড়াশোনার দায়ভার সম্পর্কে কাকা বীরেন্দ্র নাথ মন্ডলের উপর। তাতেও অভাবে টানাপোড়েন কতটুকু বা সুরাহা হত। 

কলেজ থেকে বেরিয়ে অস্থায়ী শিক্ষকতা জীবনে সামান্য বেতনে ছিল দুটো সংসারের দায়ভার। পিতার অভাবী সংসার আর 'বনানী'র সম্পাদনায় নানা প্রতিকূলতা। তবুও পত্রিকা প্রকাশের প্রচেষ্টা ছিল অদম্য। আবার শুরু সাহিত্য গড়ে তোলার হদিশ। তখন বড় সমস্যা ছিলো ভালো লেখা সংগ্রহ করা। সুদূর বসিরহাটে জল পথে যাত্রা, আবার কলকাতা-সোনারপুরে মাতলার ভাটায় জলকাদা মাড়িয়ে চলা। এভাবে চলত লেখকের লেখা সংগ্রহ। বছরে একটি করে সাহিত্য সম্মেলনে দূরাগত কবি ও সাহিত্যিকদের জানানো হতো সাদর আমন্ত্রণ। ক্রমশঃ সুন্দরবনের সাহিত্যচর্চার পরিচিতির ঢেউ প্রবেশ করত শহরের অলিন্দে। সমৃদ্ধ হতো এলাকার সাহিত্য পরিবেশ। ১৯৮২--৮৬ সাল পর্যন্ত বনানী-র এই সংগ্রাম ছিল অব্যাহত।তারপর নিজের স্নাতকোত্তর পড়াশোনার জন্য আসতে হল শহরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। গড়িয়ায় বাড়ি নিয়ে থাকা। পড়াশোনার খরচ যোগান দিতেন হিতৈষী প্রধান শিক্ষক দীনেশ চন্দ্র মন্ডল। তবে 'বনানী'র প্রকাশ থেমে যায়নি। গড়িয়া থেকে বেরোতে থাকে 'বনানী'। পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার নানা কারণ ঘিরে ধরলেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রয়াস ছিল অবিচ্ছিন্ন। 


পড়াশোনা শেষ করে আবার দুর্গামন্ডপে অস্থায়ী পদে নিয়োগ ঘটে। সেখানে কয়েক বছর 'বনানী' প্রকাশ

পেয়েছে পুনরুদ্যমে। তারপর ভর্তি হতে হলো হাজরা ল কলেজে বিএড পড়ার জন্য। যেতেও হলো কলকাতায়। এবার সোনারপুরে বনানী পত্রিকা প্রকাশের স্থায়ী জায়গা স্থিরীকৃত হলো। গড়ে উঠলো পত্রিকা গোষ্ঠী। সেখান থেকে পত্রিকা প্রকাশনার সংগঠন নির্মিত হলো। শিক্ষকতা সূত্রে গোসাবার রানীপুর এবং পরে জন্মস্থান রাধানগরে স্থানান্তরিত হলেও সোনারপুরে পত্রিকা প্রকাশের কেন্দ্রস্থল গড়ে ওঠে। সে সময় পত্রিকা সম্পাদনায় প্রসেনজিৎ রায়,স্বপন কুমার রায় প্রবীর রঞ্জন মন্ডল সহ আরো অনেকের সঙ্গে সংযোগ ঘটে। সোনারপুরে সুব্রত চট্টোপাধ্যায় চলে আসায় বনানী-র সাহিত্য পরিবেশ আরও গতিশীলতা পায়। হয়ে। 


তারপর ১৯৮৬ সালের আগস্ট মাসে শিক্ষক হিসেবে হাওড়া জেলা উলুবেড়িয়া 'বানীবন যদুরবেড়িয়া বিদ্যাপীঠে-এ নিযুক্ত হওয়ায় সম্পাদনার কাজ উলুবেরিয়া থেকে শুরু হয়। যদিও সোনারপুরে সাহিত্যচর্চার কেন্দ্রস্থল হিসেবে অব্যাহত থাকে। বিদ্যালয়ের দুই সহকর্মী 'পালা' পত্রিকার সম্পাদক শ্যামল কান্তি দত্ত এবং নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা অনুপ চক্রবর্তীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। পুজোর প্রায় ১৫ দিন বাকি, তা বুঝতে পেরে যাতে যথাসময়ে পত্রিকা বের করা যায় সেজন্য পান্ডুলিপি সংগ্রহ করে এনেছিলাম। ফলে সহকর্মী শ্যামলকান্তি দত্তের সহযোগিতায় কুলগাছিয়ায় শিল্পী তপন করের প্রেস থেকে পুজোর আগে 'বনানী' প্রকাশিত হয়। তখন

সম্পাদক শ্যামলকান্তি দত্ত ও শিল্পী তপন করের মাধ্যমে সংযোগ ঘটে পুরাতাত্ত্বিক তারাপদ সাঁতরা সঙ্গে। তাঁর সান্নিধ্য পেয়ে প্রথমদিকে 'বনানী' পত্রিকায় কবিতা- প্রবন্ধের পাশাপাশি হাওড়া জেলার লোকসংস্কৃতি শিল্প বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশ পেতে থাকে।একার্থে হাওড়া জেলা শিল্প প্রধান এলাকা। তাই আগ্রহ জাগে লোক শিল্প চর্চার করার। সর্বত্র ঘুরে ঘুরে এলাকার স্যাটেল কক, পরচুলা, শঙ্খ শিল্প, পুঁথি, মাটির পুতুল, হোগলা, মাদুর ইত্যাদি বহু বিষয়ের তথ্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগ্রহ করে বনানী-তে প্রকাশ করা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। এই সময় একটি সাহিত্যসভায় পরিচয় ঘটে কবি ও লোকসংস্কৃতিবিদ প্রসাদ মান্নার সঙ্গে। ফলে, লোক শিল্প চর্চার আগ্রহ বেড়ে যায় খুব। এভাবে সে সময়ে 'বনানী'-র প্রকাশনার ক্ষেত্রে পুরাতাত্ত্বিক তারাপদ সাঁতরা, শিল্পী তপন কর,কবি প্রসাদ মান্না প্রেরণা যুগিয়েছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে।১৯৯০ সালের মাঝামাঝি সময়ে হাওড়া জেলার এস ডি ও পবিত্র মন্ডল, উলুবেরিয়া মহকুমার এস ডি ও নীলাঞ্জন শাণ্ডিল্যের সঙ্গে পরিচয়ের ফলে কবিতা চর্চাক্ষেত্র গড়ার সুযোগ ঘটে। নীলাঞ্জনবাবুর অফিসে কবিতা পাঠের আসর বসত। তাঁরা দুজনেই মূলত কবি। পাশাপাশি, হাওড়ায় কবি সুজিত সরকার, আব্দুস শুকুর খান, প্রমোদ বসু, অজিত বাইরী,ব্রত চক্রবর্তীর সংস্পর্শে আসায় বনানী পত্রিকার পাল্লা কবিতার কাগজের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এছাড়া সম্পাদনার ক্ষেত্রে বন্ধু হয়ে ওঠেন কবি শ্যামল মান্না, মলয় সরকার, শুভেন্দু দত্ত, চিত্তরঞ্জন পাল, কালীকৃষ্ণ জাসু, মনিরুল ইসলাম, দেবাশীষ দত্ত প্রমুখ। 


'বনানী'র অধিকাংশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে উলুবেড়িয়া থেকে। সেইসব সংখ্যা প্রকাশের ক্ষেত্রে কলকাতা বা অন্যান্য স্থান থেকে সম্পাদনের ক্ষেত্রে যুক্ত হন কবি অমৃতেন্দু মন্ডল, ড. অপূর্ব বিশ্বাস, সুন্দর বন্দ্যোপাধ্যায়, কৃষ্ণ প্রসাদ মন্ডল, উত্তর বসু, পার্থসারথি গায়েন প্রমুখ।অমৃতেন্দুর অফিসে (ফুড কর্পোরেশন) বনানী-র সাহিত্য আড্ডা বসত। পরবর্তীতে পরিবহন অফিসে অফিসার পদে চলে যাওয়ার নীলঞ্জনবাবুর অফিসেও বনানীর কার্যক্রম কলকাতায় বসতে থাকে। তখন কবিতার আড্ডা তাঁর অফিসেই হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে কবি সৌমিত বসু, কবি তাজিমুর রহমান,সুনেন্দু পাত্র,মিহির সরকার, বৃন্দাবন দাস, নমিতা চৌধুরী, নাসের হোসেন প্রমুখ বনানীর সঙ্গে যুক্ত হন।


হাওড়া জেলায় প্রথম উল্লেখযোগ্য বনানী-র সংখ্যা পুরাতাত্ত্বিক তারাপদ সাঁতরা স্মরণে। প্রথম সংখ্যাটি তারাপদ সাঁতরা জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় প্রকাশ পেয়েছিল। তাতে তাঁর বহু মূল্যবান তথ্য ও নানা বিষয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছিল।পরে তাঁর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় সংখ্যাটি আরো বিস্তৃত আকারে প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে। মৃত্যুর আগে দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি উপদেশ ও নির্দেশ দিয়েছিলেন নানাভাবে।


বনানী-র আরেকটি বড় কাজ সাহিত্যিক আব্দুল জব্বার

সংখ্যা উলুবেড়িয়া থেকে প্রকাশিত। সংখ্যাটি প্রকাশের ক্ষেত্রে ছিল নানা সমস্যা। প্রতি রবিবার গঙ্গা নদী পার হয়ে সাতগাছিয়ায় তাঁর বাড়িতে যেতাম। বইপত্র তাঁর বাড়িতে তেমন সংগ্রহ ছিল না। তবে  লেখকপুত্র গৌতম সহযোগিতা করেছিল আন্তরিকতার সঙ্গে। চটের বস্তা বন্দি ছিল উল্লেখযোগ্য কাগজপত্র। সেগুলো থেকে বহু প্রয়োজনীয় চিঠি-পত্র সংগ্রহ করা গিয়েছিল। তাঁর ৬০খানা বইপত্র সংগ্রহের জন্য ২৪ পরগনা ও হাওড়ার বিভিন্ন লাইব্রেরীতে নিজেকে যেমন যেতে হয়েছিল, তেমন অনেক বন্ধু আমাকে সাহায্য করেছিল বইপত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে। মোটামুটি ছ'মাসের মধ্যে বই সংগ্রহ করে, লেখকসূচি অনুযায়ী প্রবন্ধ লেখার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে এবং দ্রুততার সঙ্গে সংগ্রহ করে সংখ্যাটি প্রকাশ করা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি জীবনানন্দ সভাঘরে বহু কবি-সাহিত্যিকদের উপস্থিতিতে। এই অনুষ্ঠানে অসুস্থ অবস্থায়ও উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক আবদুল জব্বার এবং জীবনের শেষ ভাষণটুকু দিতে পেরেছিলেন বহুকষ্টে। তারপর তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় লিটল ম্যাগাজিন 'বনানী' পুরস্কার। অনুষ্ঠানের ঠিক চারদিন পর তাঁর তিরোধান ঘটে। সেটা ছিল বড় মর্মান্তিক ব্যাপার। সেই ব্যথা বুকে নিয়ে তাঁর মৃত্যুদিন উপলক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর জীবনী 'বনানী' পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল,যা  বাংলা আকাদেমি জীবনানন্দ সভাঘরে প্রকাশিত হয়। এছাড়া তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে 'বনানী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বহু কবি, সাহিত্যিকদের নানা মতামত, উদ্বৃতি। বাংলা আকাদেমি জীবনানন্দ সভাঘরে আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রকাশও হয়। এ ছাড়া আলিপুরে থাকাকালীন তৎকালীন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার  এ ডি এম নীলাঞ্জন শাণ্ডিল্যের সহায়তায় লেখক আব্দুল জব্বারের মৃত্যুর আগে (ব্যক্তিগত অনুরোধে) মাসিক অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর স্ত্রীকে মাসিক অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। 


বনানী'র বিশেষ উল্লেখযোগ্য সংখ্যা--শত কবি শত

ভাবনা' এবং ৬৫ জন বিশিষ্ট কবির সাক্ষাৎকার প্রকাশের ক্ষেত্রে ছিল নানা সমস্যা। প্রতি রবিবারে নির্বাচিত কবিদের বাড়িতে গিয়ে কবিতা-ভাবনা সংগ্রহ করা এবং সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করা ছিল বেশ শ্রমসাধ্যব্যাপার। সংখ্যা দুটি পরস্পর প্রকাশ করা হয়েছিল বাংলা আকাদেমির জীবনানন্দ সভাঘরে বহু কবি ও সাহিত্যিকদের উপস্থিতিতে। নির্বাচিত বনানী'র সংখ্যার মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা 'উলুবেড়িয়া শিল্প- সংস্কৃতির ইতিহাস'। উলুবেড়িয়ায় অবস্থানকালীন উলুবেড়িয়ার ইতিহাস প্রকাশ করার বাসনা উদ্দীপ্ত করে আমাকে। যদিও বিষয়টা ছিল বহু পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণের বিষয়। উলুবেড়িয়ার আদিপর্ব লিখেছিলেন পুরাতাত্ত্বিক তারাপদ সাঁতরা। তাঁর আশীর্বাদে এবং কবি ও লোকসংস্কৃতিবিদ প্রসাদ মান্নার শুভকামনায় প্রকাশনা শুরু হলো দ্বিতীয় পর্যায়ের উলুবেরিয়া শিল্প সংস্কৃতির ইতিহাস। শিল্পী তপন কর, অধ্যাপক সিরাজ মল্লিকের সহযোগিতায় এবং আব্দুল্লাবাবুর আন্তরিক সদ্দিচ্ছায় আমার উলুবেড়িয়ার ইতিহাস সংখ্যা প্রকাশ করার মানসিকতা হয়ে ওঠে আরও সজীব। নিজেই পায়ে হেঁটে হেঁটে সংগ্রহ করলাম মন্দির, মসজিদ, গির্জা, পীরের মাজার ইত্যাদি বিষয়ের তথ্য, যা সাধারণত অপ্রকাশিত। এছাড়া এলাকার ঐতিহাসিক লোক সংস্কৃতিবিদ,কবি, সাহিত্যিক, গবেষকদের লেখায় উলুবেড়িয়ার জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব, ভৌগলিক বৃত্ত, স্বায়ত্ব শাসন, কৃষি আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, আর্থ সামাজিক বিবর্তন, নাট্যচর্চা, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, লোকশিল্প, পুরাতত্ত্ব, সাহিত্যচর্চা, লিটল ম্যাগাজিন ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়ের ইতিহাস প্রকাশিত। বনানী'র এই সংখ্যা প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল উলুবেড়িয়ার আগামী প্রজন্ম এই ইতিহাস পাঠে আগ্রহী হবেন এবং আগামী দিনে এই ইতিহাসকে কেন্দ্র করে গবেষণা করার সূত্র খুঁজে পাবে। 


বনানী নির্বাচিত বিশেষ আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা

কবি বিনোদ বেরা সংখ্যা।পত্রিকা সম্পাদনার মূল উদ্দেশ্য যেসব কবি সাহিত্যিকদের প্রচারের আলোয় আসা সম্ভব হয়নি তাদের জীবন, সাহিত্যকৃতি পাঠকসমাজে তুলে ধরা।কবি বিনোদ বেরা সংখ্যাও তার একটি অন্যতম প্রকাশ। এই সংখ্যাটি প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রাবন্ধিক-গবেষক সুব্রত চট্টোপাধ্যায়ের অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া গবেষক ড. বরেন্দু মন্ডল,কবি- সম্পাদক প্রবীর মন্ডল এবং বিনোদ বেরার স্ত্রী ও কন্যারা আর কবি- শিল্পী শ্যামল মান্নার সম্পূর্ণ সহযোগিতা আমাদের পাথেয় হয়ে উঠেছিল। সংখ্যাটি প্রকাশের ক্ষেত্রে পত্রিকা সম্পাদকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই সংখ্যায় লেখা বিদ্বজ্জনের চিঠিপত্র, বিভিন্ন দশক ভিত্তিক কবি ও সাহিত্যিকদের কবির কবিতা পর্যালোচনা, কাব্যগ্রন্থ আলোচনা ও স্মৃতিচারণ ইত্যাদি নানা বিষয় বিধৃত।কৃষক কবি বিনোদ বেরার কাব্যকৃতি বনানীতে প্রকাশ করে পাঠকসমাজে তুলে ধরতে পারাটাই আমাদের গর্ব।





Comments

  1. দারুণ এক উদ্যোগ।
    আধীরদার প্রতি শ্রদ্ধা।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

কবি-প্রাবন্ধিক আমীরুল আরহাম

কবি অভিজিৎ বেরা

কবি সংস্কৃতি বন্দ্যোপাধ্যায়