কবি-প্রাবন্ধিক দীপক হালদার
দীপক হালদার
কবি-প্রাবন্ধিক দীপক হালদার
সাতের দশকের শেষ নাকি আটের দশকের প্রথম, মনে পড়ে না ।কবি বাসুদেব দেব তখন ডায়মন্ডহারবারে কর্মরত ।আমাদের প্রায়শ যাতায়াত ছিল তাঁর কাছে উষ্ণতা পেতে।এরকম একদিন তিনি একটি নতুন কাব্যগ্রন্থ তুলে দিলেন আমার হাতে, বললেন এই বইটির একটি আলোচনা লিখে আমাকে দিয়ে যেও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ।শিক্ষানবিশী কালের ওই প্রথম পর্বে আকস্মিক এরকম একটি আহ্বান এবং নির্দেশ আমাকে আলোড়িত করল।কাব্যগ্রন্থটির নাম 'জাতক বাউল',কবি ইন্দ্রনীল দাস।কবি ইন্দ্রনীলের কিছু কিছু কবিতা পড়ার সুযোগ হয়েছে ততদিনে ।'দেশ', 'অমৃত'র মত প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার সাথে বেশ কিছু সর্বমান্য লিট্ল ম্যাগাজিনে নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হয় ।সেখানেই পড়েছি তাঁকে।কিন্তু আজ যখন তাঁর একটি ঝাঁ চকচকে হাতে গরম নতুন কবিতার বই হস্তগত আমার ,তখন একদিকে আনন্দ অন্যদিকে বুক ঢিপ ঢিপ ।কারণ, কালপ্রতিমার মতো একটি প্রতিষ্ঠিত ও সর্বজনগ্রাহ্য কবিতাপত্রে পুস্তক পর্যালোচনার নির্দেশ স্বয়ং কবি বাসুদেব দেব এর ।দুরু দুরু মনে বাড়ি ফিরলাম বইটি নিয়ে ।পড়ে ফেললাম কয়েকবার।লিখলাম আলোচনা ।বাসুদেবদাকে দিয়েও দিলাম ।বললেন, পরে জানাবেন ওটা প্রকাশযোগ্য কিনা।সপ্তাহখানেক পরে জানালেন ছাপা হবে কালপ্রতিমায়, বললেন আরও গভীর ও তাৎপর্যবাহী আলোচনা হলে ভালো হত।
এভাবেই কবি ইন্দ্রনীলের জগতের সাথে আমার যোগাযোগ ।পরে ডায়মন্ডহারবারের ফকিরচাঁদ কলেজের এক কক্ষে নেহরু যুব কেন্দ্রের উদ্যোগে এক কবি সম্মেলন আয়োজিত হয়।বহু বিখ্যাত ও লব্ধপ্রতিষ্ঠিত কবির আগমন ঘটেছিল ওই অনুষ্ঠানে ।এসেছিলেন কবি ইন্দ্রনীল দাসও।ওখানে তাঁর সাথে আলাপ হয় ।বাঙলা কবিতা জগতে ইন্দ্রনীল তখন এক সুপরিচিত নাম । আমার যথেষ্ট কুন্ঠা তাঁর সাথে স্বচ্ছন্দ আলাপচারিতায়।তেমন পরিচিত নই আমি । তাছাড়া আমার অক্ষমতা ।অযোগ্যতা বললেও কম বলা হয় না ।তখন আমার লেখালেখির সীমানা কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন মাত্র ।আর ইন্দ্রনীল দাস একটি কাব্যগ্রন্থের সুখ্যাত জনক নন শুধু, বহু বহু কবির সখ্য তাঁর কবিতা সৃজনশীলতার পথে অপার্থিব অর্জন ।সেই তিনি যখন কথা বললেন আমার সাথে আমি প্রায় নীরবে শুনতে লাগলাম তাঁর কথা,দেখতে লাগলাম তাঁকে।
আপাদমস্তক গ্রাম্যতায় মোড়া তাঁর অবয়ব ।পরনে ইস্ত্রি ছাড়া ধুতি পাঞ্জাবী,কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। জানতে পারলাম পেশায় তিনি একজন শিক্ষক।একটি প্রাথমিক স্কুলে কর্মরত ।কথায় কথায় জানালেন কবি সামসুল হক তাঁর প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় কবি ।কবি সামসুল হক এর সাথে নিত্য যোগাযোগ তাঁর।আলাপচারিতায় অত্যন্ত সহজ সরল স্বাভাবিক ।জড়তার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই তাঁর কথায় ।বললেন, বাসুদেবদার কাগজে আমার বই নিয়ে আপনার আলোচনা দেখলাম ।পড়া হয়নি এখনো ,পড়ব। এর পরে পরে অনেক অনেকবার দেখা হয়েছে তাঁর সাথে।আপনি থেকে তুমিতে আমরা দুজনে ।একে একে ষোলোটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ইন্দ্রনীলের ।কিন্তু এখনকার
এই সময়ে কেমন যেন আড়ালে নির্বাসন নিয়েছেন তিনি নিজের থেকেই । তাঁর সাধন কক্ষ তাঁর নিজের গ্রামের বাড়ি।আজকের দিনের চটজলদি মেলামেশা ও আলাপচারিতায় অভ্যস্ত নন ইন্দ্রনীল ।শান্ত এক
অনন্য আভরণ তাঁর চিরসহচর।আর সেই নম্র অভিধানে ব্রতী ও নৈমিত্তিক যাপনচিত্র পাঠের ঐকান্তিক সন্ধিৎসা তাঁর নিরবচ্ছিন্ন কবিতা চর্চার পাথেয়,হয়তোবা বল্মীক কুঠিও।কাকদ্বীপ মহকুমার প্রত্যন্ত এক গ্রাম গনেশপুরের বাসিন্দা ইন্দ্রনীল ।বয়স চুয়াত্তর প্রায়।অথচ এখনো সমস্ত রকমের প্রাতিষ্ঠানিকতার থেকে দূরে বসে নিয়মিত কলমে কাগজে ব্যস্ত থাকেন তাঁর প্রিয় শব্দবন্ধ 'শব্দবতী'র আরাধনায়।তাঁর কবিতায় জন্মকবচের মত লেগে থাকে পল্লীবাংলার গাছগাছালি, পাখিপাখালির নিত্য চলচ্ছবি।
আর তাই তিনি লিখে চলেন কালের রাখাল হয়ে নিত্যদিনের সেই চিরন্তনী গাথা।প্রচারবিমুখ এই মানুষটিকে তখন মহাভারতযুগের একলব্য বলতে সাধ যায় ।বৃদ্ধাঙ্গুলি কাকে যে কখন দিতে হবে জানেন না তিনি, তবে সর্বদা টানটান প্রস্তুত ইন্দ্রনীল নিজের সবটুকু নিয়ে ।তাঁর সাথে কথাবার্তায় যেটুকু জেনেছি ,তাতে তাঁর দ্রোণাচার্য হিসেবে কবি সামসুল হককে ধরে নিয়েছি।যদিও তিনি বলেননি কিছু, ওই ভাবনা আমার নিতান্ত অনুমান মাত্র ।কবি জীবনে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির কোনো হিসেবের মধ্যে থাকেন না তিনি ।বলেন 'আমার কাজ লেখা, সেটা ঠিকমতো করতে পারলেই খুশি'।তথাকথিত কবি আভরণের বিন্দুমাত্র নেই তাঁর চলনে বলনে ।অনাবশ্যক আভরণে বড্ড অনীহা তাঁর ।আত্মমগ্ন তিনি।হয়তো সে কারণে তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসে নিম্নোধৃত শব্দ বলয় ।
'সমস্ত শব্দকে ভেঙে এক কবি তার জীবনের শূন্যতা দেখায়',জাতক বাউলের কবি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের 'সুধাময় জাগরণ ' কবিতায় উচ্চারণ করেন এই সত্য ।লেখেন 'এইভাবে সমস্ত শব্দকে ভেঙে তার জীবনের পূর্ণতা দেখায়'--- এমনতর উপলব্ধির সারসত্য ধরে দেন নির্দ্বিধায় ।কবি জীবন এই টানাপোড়েনে এগিয়ে চলে দরিয়া অভিমুখে।সমসাময়িক ঢেউ সামলে এগিয়ে চলেন কবি ।তখনকার দিনে বেশ কিছু পত্র- পত্রিকার পাতায় নিয়মিত তাঁর উপস্থিতি ঘটলেও বর্তমানের দিনে তাঁর কবিতা খুব বেশি চোখে পড়ে না।কয়েক মাস আগে দেশ- এ অবশ্য তাঁর কবিতা চোখে পড়েছে ।বর্তমানের দিনে পত্রিকার পৃষ্ঠায় তাঁর অনুপস্থিতির কারণ কি? জানতে চাওয়ায় উত্তর দিয়েছিলেন-- ভালো লাগে না লাগাম ছাড়া ছোটাছুটি করতে করতে লেখালেখিতে এবং প্রকাশে।তাঁবেদারি করতে শেখেননি ইন্দ্রনীল ।বললেন, কবিকে সারাক্ষণই চর্চার মধ্যে থাকতে হয় ।আর সেটাই তিনি করে চলেছেন নিয়মিত ।তাই, প্রকাশ- অপ্রকাশে কোনো ক্ষোভে দুঃখ যন্ত্রণা ,অভিমান কিছুই নেই তাঁর ।তিনি তাঁর কলমের কাছে দায়বদ্ধ ।তাঁর অত্যন্ত প্রিয় মানুষ, শ্রদ্ধেয়কবি হক সাহেব ( সামসুল হক ) তাঁর মনে এবং মননে সতত বিরাজমান। বলেন,লিখছি, লিখে চলেছি, লিখে চলবও।মাটি, মানুষ, প্রকৃতি তাঁর রসদ , তাঁর পাথেয়।সুন্দরবনের নদ - নদীর নান্দনিক আনন্দসঙ্গ তাঁর স্বরূপ রচনা করে। এলাকার খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষজনের সঙ্গ তাঁর রোজকার যাপন উপার্জন।তাঁর কবিতার নোনা ও জোলো বাতাসে মিশে থাকে কৃষিজীবী সাধারণ মানুষের স্বাদ,রক্ত, স্বপ্ন ।ইন্দ্রনীল ভালোভাবেই জানেন তা।জানেন ব'লে তাঁর কাব্যভূমিতে যে ভাষায় কথা বলেন তিনি তা হয়তো সবসময় আধুনিককালের চটকদারিতার অনুগত ও ছিমছাম হয় না। প্রকৃতিপরমে তাঁর অধিবাস এবং বিশ্বাস ও। প্রতীক,উপমা, চিত্রকল্প, রূপকল্প ছন্দ সকলেই নিজের নিজের রঙে মিশে গেছে তাঁর কবিতায়।ইতিহাস, সমাজ আন্দোলনের ছায়াছবি খেলা করে তাঁর সুপ্রযুক্ত কবিভাষায়।আপাদমস্তক সামাজিক তিনি।তাঁর চোখে সবই ধরা পড়ে।
১.
'সে কেবল এক হাতে ধরেছিল মানুষের অনন্ত জীবন
সেই খন্ডিত ভারতবর্ষের তার আবরণহীন স্মৃতি
সেখানে শুকোয় আমাদের পূর্বপুরুষের অর্জিত সুখ ও সমৃদ্ধি
তার জ্যোৎস্নার হিমে শুয়ে থাকে জাতক বউল স্বপ্নের ভিতর
এক অলৌকিক হাত দেখে শিখেছিল শিল্প ও জীবন
যার এক হাতে পৃথিবীর সম্পন্ন খরা ও বর্ষণ ঋতুচক্রের মতো
আমাদের সমস্ত কবিদের শিল্প- সাধনার মতো'
--- জাতক বাউল,জাতকবাউল
২.
'আমার সামনে দাঁড়াল সে মেয়ে
কী কথায় পায় আমাকে নিবিড়ে
বলবে : স্বপ্নের ঘটা কোন্ টানে!
আমার বিস্ময় সেখানে কি জ্বলে
তার ভিতরের হাজার প্লাবনে?
--- মানুষের ভিতরে, ঘাসপাতা রঙের পরি
উদ্ধৃতি কন্টকিত করতে ইচ্ছে হয়না তাঁকে নিয়ে বলা কথোপকথনে।কতই বা উদ্ধৃতি তুলতে পারি? কটা? তাই ও প্রসঙ্গে বিরতি টানি। বরং সবিনয়ে জানাই কোন্
একাগ্রতায় বসে বছরে বছরে তিনি নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছেন তাঁর কবিতার সৃজনকথা!অবশ্যই শ্রদ্ধানত ভাবতে হয় সেকথা।সত্তরের নিষ্ঠাবান ও একাগ্রচিত্ত
কবি ইন্দ্রনীলের কবিতাসংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে দুটি খন্ডে।প্রথম খন্ডে সাতটি কাব্যগ্রন্থ এবং দ্বিতীয় খন্ডে আটটি কাব্যগ্রন্থ গৃহীত হয়েছে ।দুহাজার ঊনিশে প্রকাশিত ওই সংগ্রহ দুটির পরে দুহাজার একুশের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আরও একটি কাব্যগ্রন্থ ।যতদূর জানি দুহাজার বাইশের প্রথমদিকে আরও একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হতে চলেছে তাঁর ।কবির এই ঐকান্তিক কবিতা চর্চা নিঃসেন্দহে অনুসরণযোগ্য ।কাব্য বিচারের ভার কালের হাতে থাক।সময় বলবে তিনি কি লিখেছেন, কেমন লিখেছেন,কেন লিখেছেন।আমাদের শুধু তাঁর নতমাথা সাধনার একাগ্রতাকে সাধুবাদ দিতে ইচ্ছে করে ।ইচ্ছে করে তাঁর কাব্যভূমিতে সনিষ্ঠ চোখ রাখতে,তাহলেই হয়তো জানা যাবে তাঁর এতদিনের প্রয়াসের সার কথা ।।তবুও, তবুও তাঁর কবিতা ছেড়ে যেতে মন চায় না ।তাই তাঁর নবতম কাব্যগ্রন্থ থেকে তুলে ধরি সময় সচেতন কবি ইন্দ্রনীল দাস এর কয়েকটি লাইন, যা তাঁকে নতুন রূপে চেনাতে সাহায্য করতে পারে বলে বিশ্বাস ।
'রাজার ঘোড়ারা সব কবে যাবে,সই!
তাদের যে দাপাদাপি, এত হই- চই------
নিজেদের জাহিরের
নানা কথা ফকিরের,
যত শুনি তত যেন বোবা হয়ে রই।
পাড়ার লোকেরা বলে-- নানা কথা সই,
এসব রটেছে দেশে জল থই থই---
লম্বা হাত ব'লে নাকি
যত পারে দেবে ফাঁকি,
কিছুতে - না হবে তাতে রাহাজানি, হৈ
জনরোষে জেগে আসে নানা কথা ঐ।
--- কবে যাবে, সই, রাজার ঘোড়ারা দিলখুশ
Comments
Post a Comment