কবি-অনুবাদক তপন কুমার মাইতি



তপন কুমার মাইতি

জন্ম:-১লা নভেম্বর,১৯৫৩। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম থানার অন্তর্গত সামসাবাদ গ্রামে। শিক্ষা:- স্নাতকোত্তর (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) কর্মজীবন:- ১৯৭৬ সালে হিন্দুস্তান ফার্টিলাইজার কর্পোরেশন লিমিটেড হলদিয়ায় কর্মরত। ২০০৩ সালে স্বেচ্ছায় অবসর। ১৯৭০ সালে কলেজ জীবন থেকে কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ করার মধ্য দিয়ে লেখালেখি শুরু। সম্পাদিত পত্রিকা:-অনুত্তর, প্রমিতাক্ষর। গ্রন্থাবলী:-- কবিতা-১৮,প্রবন্ধ-৬, অনুবাদ-৭ সংকলন-৭ স্মৃতিকথা-১। পুরস্কার:--বেণুকা সাহিত্য সম্মান(২০০৬), শৈবভারতী পুরস্কার(২০১৬), কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র পুরস্কার(২০১৫),কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার (২০২১) ও কবি নিরলা সাহিত্য সম্মান(২০২১)।

ফরাসি কবি জাঁ নিকোলাস আর্তুরো রাঁবো-র কবিতার অনুবাদে কবি-অনুবাদক তপন কুমার মাইতি

















আ সিজন ইন হেল- র কবি রাঁবো


জাঁ নিকোলাস আর্তুরো রাঁবো ১৮৫৪ সালের ২০ অক্টোবর উত্তর ফ্রান্সের  আরদেঁস-এর একটি শহর শার্লেভিঞতে জন্মগ্রহণ করেন। মাতা মেরী ক্যাথারিন ভিতালি ও পিতা ফ্রেডেরিক রাঁবো।বিস্ময়কর বালক প্রতিভা। যখন বয়স সতেরও না আর্তুর রাবাে (১৮৫৪-১৮৯১) প্যারিসের সাহিত্যিক সমাজকে উত্তেজিত করে তুলেন তার যতসব ফ্যাসাদ উদ্রেককারী কবিতা দিয়ে। তিনিই পরবর্তীতে বিশ শতকে এসে পাবলাে পিকাসাে থেকে শুরু করে জিম মরিশনের মতাে অনেকেরই গুরু পীরে পরিণত হন। “আ সিজন ইন হেল’ ‘দ্য ড্রাঙ্কেনবােট এবং গদ্য কবিতা ইলিউমিনেশন্স’ এর মতাে কাজ দিয়ে নতুন যুগের আরম্ভ করেন যা প্রচলিত আর্ট ফর্মের জগতকে পুরােপুরি পাল্টে দেয়। যদিও মাত্র কুড়ি বছর বয়সে কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ' A season in Hell.' ১৮৯১ সালের ১০ই নভেম্বর তার মৃত্যু হয়।


ক্ষুধা 


আমার যদি কোন খাওয়ার থাকে, তা কেবল

পাথর ও মাটি ছাড়া আর কিছু নয়।

আমি সর্বদা প্রাত:রাশ করি হাওয়া 

কয়লা, লোহা ও পাথর খেয়ে।


আমার ক্ষুধা ঘুরে যায়। ক্ষুধার 

চিবানোর শব্দে মাঠ ভরিয়ে দেয়। 

শুষে নেয় চটকদার বিষ  

মাঠের লতাগুল্ম থেকে। 


ভঙ্গুর জিনিস খাই, পাথরকুচি,

পুরনো গির্জার ধ্বংসস্তূপের পাথর; 

প্রাচীন বন্যার পাথরের স্তূপ

রুটির মতো দেখাচ্ছে ধূসর উপত্যাকা।


ঝোপের ভেতর শেয়ালের চিৎকার

মসৃণ পালকে থুতু ছেটায় 

সামান্য আহারের উপর, 

তার মতো আমি নিজেও খাই 


ফল ও সবজি 

অপেক্ষায় থাকে সংগ্রাহকের; 

কিন্তু ঝোপের ভেতর মাকড়সা 

ভায়োলেন্ট ফুল ছাড়া কিছুই খায় না। 


আমাকে ঘুমতে দাও! সোলোমানের 

বিজ্ঞতার তাপে আমাকে উষ্ণ হতে দাও।

মরচে ঝরিয়ে দাও, ফুটন্ত জল 

মিশে যাচ্ছে কিদ্রোনে।


অবশেষে, হে সুখ, হে যুক্তি  আমি আকাশ থেকে নীল তুলে আনি, বস্তুত যা কালো এবং প্রকৃতির আলোর স্বর্ণদ্যূতির ভেতর আমি বেঁচেছি। আনন্দ থেকে আমি আহরণ করেছি প্রকাশভঙ্গির চূড়ান্ত অতিরঞ্জনের গৌরব:


আমরা দেখতে পেলাম! 

কী দেখলাম? চিরন্তন। 

এই তো সূর্য, যা মেশে

                     সাগরে। 


আমার অমর আত্মা 

তোমার প্রতিজ্ঞা পালন কর 

রাত্রির শূন্যতা 

এবং দিনের উজ্জ্বলতার মধ্যে।


এইভাবে তুমি বৈচিত্র পাবে 

মরণশীল সন্তাপ থেকে 

সাধারণ প্রাণোদনা থেকে, 

ডানা মেলতে যেমন ইচ্ছে। 


আশা নেই, ছিল না কখনও, 

কোন অনুনয় এখানে নয়। 

বিজ্ঞান ও সহিষ্ণুতা 

নির্যাতন কেবল সত্য। 


আগামীকালের জন্য কিছু নেই, 

চকচকে ছাই, 

তোমার নিজস্ব আবেগ 

কেবল একমাত্র কর্তব্য।

আমরা দেখতে পেলাম 

কী দেখতে পেলাম? চিরন্তন। 

এই তো সূর্য, যা মেশে সাগরে।


আমি হয়ে উঠলাম এক অবিশ্বাস্য অপেরা। আমি দেখলাম সমস্ত জীবন সৌভাগ্যের সুখ চায়: উদ্যোগ জীবন নয়, শক্তি অপচয়ের উপায় মাত্র, এক ধরনের দৌর্বল্য। নৈতিকতা এক ধরনের মেধার দুর্বলতা। 

প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে, আমি অনুমান করি, অন্য জীবন যেন প্রাপ্য থেকে থেকে যায়। এই ভদ্রলোক জানেনা সে কি করছে, সে একজন দেবদূত। এই পরিবার একদল কুকুরের আস্তানা। পূর্বে অনেক লোকের সঙ্গে আমি উচ্চস্বরে তাদের অন্য একটি জীবনের সঙ্গে কথা বলছি।-- এভাবে আমি একটি শূকরকে ভালোবেসেছি। 

কিছুতেই উন্মত্ততার কুটতার্কিকতা এ নয়--যে উন্মত্ততাকে তারা বন্ধ করে দিয়ে গেছে-- আমি তা ভুলে গেছি। আমি তাদের স্মরণে আনতে পারি, পদ্ধতি আমার জানা। 

আমার স্বাস্থ্য ভয় দেখাচ্ছে। ভীতি উপস্থিত। আমি তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম কয়েকদিন এবং জেগে উঠে চরম দুঃখের স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। আমি মৃত্যুর জন্য পরিপক্কতা লাভ করেছি এবং বিপদজ্জনক রাস্তা ধরে আমার দৌর্বল্য আমাকে পরিচালিত করেছিল পৃথিবীর অন্ধকার জগতে এবং সিমারিয়ায়, যে-দেশ ছায়া ও ঘূর্ণিঝড়ের।


আমি পরিভ্রমণ করতে বাধ্য হই, আমার মস্তিষ্কে যে মায়াজাল ভিড় করে আসে তার থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য। সমুদ্রের উপর, যা আমি ভালবাসতাম, যেন নিজের কলুষতা নিশ্চিতভাবে ধুয়ে দিচ্ছি। আমি দেখলাম সান্ত্বনার ক্রুশের উত্থান। রামধনু আমাকে জাহান্নামে পাঠিয়েছে। সুখ ছিল আমার নিয়তি নির্বন্ধ। আমার সন্তাপ, আমার ক্রিমিজাতীয় কীট: আমার জীবন চিরকাল থাকবে ব্যাপ্তি, শক্তি ও সৌন্দর্য অর্জনের জন্য।


সুখানুভূতি! তার দাঁত, মৃত্যু অবধি ঘাম ঝরানো, কাকের ডাকের মতো আমাকে সতর্ক করছে--এড ম্যাটুটিনাম, ক্রিস্টমাস ভেনিটে-- সবচেয়ে অন্ধকার শহরগুলিতে: 


হায় ষড়ঋতু, হায় দুর্গ! 

কোথায় সেই ত্রুটিহীন আত্মা?


আমি জাদুর অনুসন্ধানী;

হায় সুখানুভূতি; কেউ এগিয়ে যেতে পারে না। 


তার থেকে স্বাস্থ্যোদ্ধার, প্রতিবার 

গলদেশীয় মোরগ আমাকে উড়িয়ে নেয়।


আহা! আমার আকাঙ্ক্ষার কিছু নেই, 

সেটাই আমার জীবনের স্বাধিকার। 


সেই মাধুরী আমার হৃদয় ও আত্মাকে মুগ্ধ করে রাখে 

আমার সকল প্রয়াসকে বিক্ষিপ্ত করে। 


হায় ষড় ঋতু, হায় দুর্গ! 


তার উড়ার সময় এখন, হায়! 

সেই সময় আসবে আমার যাওয়ার। 


হায় ষড় ঋতু, হায় দুর্গ! 


সে সব অতীত এখন।আমি জানি এই দিনগুলো            কীভাবে সুন্দরকে অভিনন্দন জানাবে।





Comments

Popular posts from this blog

কবি-প্রাবন্ধিক আমীরুল আরহাম

কবি আবু রাইহান

কবি অভিজিৎ বেরা